দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি, শিক্ষা, নারী ও শিশু, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, ফিলিস্তিন ইস্যু, নিরস্ত্রীকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটিই ছিল তার প্রথম ভাষণ।
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ এখন ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
ভাষণে নিজের পরিবারের সঙ্গে জাতিসংঘের স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, তার বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়া একই জাতিসংঘের মঞ্চে দেশের ও জনগণের কথা বলেছেন। এবার তিনি সেই মঞ্চে দেশের মানুষ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পক্ষে কথা বলছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত নিয়েও উদ্বেগ জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, সংঘাতের কারণে অস্থিরতা, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ও মূল্যস্ফীতি তৈরি হচ্ছে। এসব সংকটের সমাধানে সংলাপ, কূটনীতি ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, ন্যায়সংগততা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার বিরোধিতা করে তিনি সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তারেক রহমান ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গা সংকট
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ নয় বছরের বেশি সময় ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানে। নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান বলে উল্লেখ করে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহায়তা চান তিনি। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ু ও পানি ব্যবস্থাপনা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন কার্যক্রমে আরও জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানান। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথাও বলেন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানো এবং পানি সংরক্ষণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। আন্তসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের পানি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে।
অর্থনীতি ও উন্নয়ন
দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠনের তিনটি লক্ষ্য সামনে রাখার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে নারীদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
৩১ দফা ও শিক্ষা
সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৭৩ শতাংশ সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ পরোক্ষভাবে সামঞ্জস্য রয়েছে বলে ভাষণে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের কথা বলেন তিনি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ শিক্ষা বাজেটের কথা তুলে ধরে আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি জানান, নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি এবং ব্যাবহারিক শিক্ষা উপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ এবং পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমের অংশ করার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুন মাসে দেশব্যাপী মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায় এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন, বাজারসুবিধা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান তিনি। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা উৎপাদনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বিনিয়োগ
ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে উঠতে হলে নাগরিকদের ক্ষমতায়ন জরুরি। দল, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরির কথা জানান তিনি।
যুবসমাজ, নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রত্যয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’ বার্তা দিয়ে।
/অ